৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছিলো। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, নেতৃত্বগত দূরত্ব ও কৌশলগত ভিন্নতা থাকলেও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সবার মনে একটি বড় উপলব্ধির জন্ম হয়। আর তা হলো আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলাদা আলাদা থেকে কাঙ্খিত বিজয় অর্জন করা সহজ নয়।
সেই উপলব্ধি থেকেই ইসলামপন্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার গতি বাড়ে। জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস সহ সমমনা দলগুলি পরস্পরের অফিসে গিয়ে মতবিনিময় করে। ফলশ্রুতিতে প্রথমে গড়ে ওঠে ১০ দলীয় জোট। উপরোক্ত তিন দল ছাড়া এই জোটের অন্যান্য শরীক দলগুলো ছিলো যথাক্রমে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, এলডিপি, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি যুক্ত হওয়ায় এটি ১১ দলীয় জোটে রুপ নেয়। এই জোটটি কেবল একটি সংখ্যার জোট ছিলো না; বরং দীর্ঘদিনের বহুল আকাংখিত ‘নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ওয়ান বক্স’ নীতি বাস্তবায়নের একটি শক্ত বার্তা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছিলো। পাশাপাশি এর মাধ্যমে ইসলামপন্থীদের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি বাস্তবসম্মত বিজয়ের আশাও তৈরি হয়েছিলো। কারণ দলগুলো এককভাবে নির্বাচন করলে যে ভোট বিভাজন হতো, জোটের মাধ্যমে তা কমে আসার একটা বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা দেখা যায়। কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়, মাঠে কাজের গতি বাড়ে এবং সাধারণ ভোটারদের কাছেও একটি ঐক্যবদ্ধ বিকল্প শক্তির চিত্র ফুটে ওঠে। অনেকেই ভাবতে শুরু করেন—এবার হয়তো ইসলামপন্থীরা সত্যিকার অর্থেই সংসদে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
কিন্তু বিধি বাম। জোটের জন্য সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে আসন বণ্টনের সময়। কে কয়টি আসনে প্রার্থী দেবে, কোন এলাকা কার জন্য ছাড় দেওয়া হবে—এই প্রশ্নগুলোতেই মূলত মতানৈক্য প্রকট হয়। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হওয়ায় ১১ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে যায় চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
এই ঘটনা অনেককে হতাশ করলেও আমরা মনে করি বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী রাজনীতিতে এটিই শেষ কথা হতে পারেনা। কারণ জোট ভাঙা মানেই যে জোট গঠনের মূল উদ্দেশ্য চিরতরে ব্যাহত হয়েছে হয়ে গেছে—তা নয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে না থাকলেও একবাক্সনীতি রক্ষা করা এখনো সম্ভব। এর বাস্তব উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। যেমন, জামায়াত ইতিমধ্যে বরিশাল-৫- আসনে ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমীর মুফতি ফয়জুল করীমের আসনে তাদের প্রার্থী দেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা একটা রাজনৈতিক ভদ্রতার ইঙ্গিত। অপরদিকে ইসলামী আন্দোলনও জামায়াত ও খেলাফত মজলিসের আমীরদ্বয়ের আসনে প্রার্থী দিচ্ছে না। এটি একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও কৌশলগত পরিপক্বতার পরিচয় হিসেবে ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। ঠিক একইভাবে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন বর্তমান ১০ দলীয় জোট যদি ইসলামী আন্দোলনের জন্য রেখে দেওয়া ৪৯ টি আসনে কোনো প্রার্থী না দেয়, তাহলে মাঠে ভোট বিভাজন অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি জোটের কাছে ইসলামী আন্দোলনের সর্বশেষ যে দাবি ছিল—৮০টি আসন—সেটি পূরণ করতে হলে ৪৯টির বাইরে যে কয়টি আসনে প্রার্থী দিতে হয়, সেগুলোতে প্রার্থী দিয়ে বাকি আসনগুলোতে প্রার্থী না দিয়ে জোটের প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করা যেতে পারে।
একই সাথে আরো কয়েকটি উপায়ে এই পদ্ধতিকে অধিকতর সুন্দর ও কার্যকর করা যায়।
১. অনানুষ্ঠানিক হলেও ১০ দলীয় জোট ও ইসলামী আন্দোলনের মাঝে একটি ন্যূনতম সমন্বয় কমিটি গঠন করা, যারা নির্বাচনী এলাকার বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।
২. স্থানীয়ভাবে প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে ভোটারদের জানানো—কোন আসনে কাকে সমর্থন করা হবে।
৩. মাঠপর্যায়ে কর্মীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা, যেন তারা বিভ্রান্ত না হয়।
৪. নির্বাচনের আগে ও চলাকালীন সময়ে পারস্পরিক আক্রমণ বা নেতিবাচক বক্তব্য পরিহার করা।
৫. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ইসলামী রাজনীতির বিজয়ের এই সুযোগকে শতভাগ কাজে লাগানোর মানসিকতা।
কারণ জোট ভেঙে গেলেও লক্ষ্য তো একই—ইসলামপন্থী রাজনীতির শক্ত অবস্থান তৈরি করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে জামায়াত জোট ও ইসলামী আন্দোলন পুনরায় কৌশলগতভাবে ভাবতে পারে। আনুষ্ঠানিক জোট না হোক, বাস্তবে একে অপরকে সহযোগিতা—এই পথেই হয়তো একবাক্সনীতি রক্ষা করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ফল আদায় করা সম্ভব। অন্যথায় এই ভুলের মাশুল আরো বহু যুগ ধরে দিতে হতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও জনবক্তা
মন্তব্য করুন