জামায়াতের নেতাকর্মীরা ৬৮ টি আসনে জয় লাভ করেও আফসোস কেন করছে বুঝতে পারছিনা। তাদের তো বরং খুশী হওয়ারই কথা। এবারের নির্বাচনে তারা আশানুরূপ রেজাল্টই অর্জন করেছে। যদি ১৫০ এর বেশী আসন পেয়ে যেতো, তবে তা হতো ‘আশাতীত এক বিপ্লব’, যার জন্য জামায়াত দল হিসেবে এখনো যথাযোগ্য নয় বলেই আমার বিশ্বাস। আশা করি জামায়াতের নেতাকর্মীদের ভাবনাও ভিন্ন হবেনা।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পতিত সরকারের নেতাকর্মীদের প্রতি জামায়াত আমিরের ক্ষমাসুন্দর বক্তব্য, ন্যায় এবং ইনসাফের বিভিন্ন প্রবচন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয় এবং জামায়াত আমিরকে রীতিমতো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায়। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের অনস্বীকার্য ভূমিকা সংগঠনটিকে জেন জি এবং অরাজনৈতিক তরুণ সমাজের নিকট অধিকতর পছন্দনীয় করে তোলে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিমন্ডলে শিবির একচেটিয়া গ্রহনযোগ্যতা লাভ করে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের প্রায় সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয়। এই সকল কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে যদি জামায়াতের নেতাকর্মীরা মনে করে থাকে যে, সংসদ নির্বাচনেও তারা একচেটিয়া জয় লাভ করবে, তাহলে নিরেট বোকার স্বর্গে বাস করছিলো তারা এবং অবধারিতভাবে নির্বাচনে মাত্র ৬৮ টি আসনে জয় লাভ করে ইতোমধ্যে সেই বোকামির খেসারতও দিয়েছে।
জামায়াতের ভুলে গেলে চলবেনা, বিএনপি জনসমর্থনের দিক থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। যে কোন ক্যারিশমা করে রাতারাতি এই দলের জনসমর্থন কমানো সম্ভব নয়। চাঁদাবাজি, দূর্নীতির উর্ধ্বে উঠে শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা -ভালোবাসার কারণে বিএনপিকে ভালোবাসে এমন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি। এরা যে কোন পরিস্থিতিতে বিএনপিকেই ভোট দেবে।
তাছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ জনগন এখনো আক্ষরিক অর্থে ভোটের আমানতদারিতা সম্পর্কে সচেতন নয়। একটি ভোট যে দেশের আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে, তাও বেশিরভাগ মানুষের বোধগম্য নয়। প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, ন্যায়পরায়নতা- এসব বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হয়নি আজ অবধি। বেশিরভাগ ভোটার এখনো ভোট দেয়, কোন দল বা কোন প্রার্থীর পাল্লা ভারী, তা দেখে। পাশাপাশি ভোট পরবর্তী সহিংসতার ভয়ভীতি দেখানোর সংস্কৃতি তো রয়েই গেছে। শুধু ভয়ভীতিই নয়, বাস্তবেও ইলেকশন পরবর্তী গত দু’দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিরোধী দল ও মতের মানুষদের বাড়িঘর ভাঙ্গা, আগুন দেওয়া এবং তাদের উপর সীমাহীন নিপীড়ন নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পরে এমন ঘটনা ভাবা যায়? কিন্তু বাস্তবে তাই হয়েছে। সুতরাং একারণেও সাধারণ মানুষ বড় দলের বাইরে অতীতে খুব একটা ভোট দেয়নি, ভবিষ্যতেও দিবেনা, এটাই স্বাভাবিক।
অর্থাৎ জামায়াতকে বুঝতে হবে, ‘দিল্লি’ আভি বহুত দূর হায়। কেবল আবেগ দিয়ে মানুষের ভোট আদায় করা যাবেনা। বাস্তবতা অনেক কঠিন। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু নির্বাচনে হেরে এদিকে ইঙ্গিত করেই ফেসবুকে লিখেছেন,
‘বিএনপি অভিজ্ঞ দল, তার প্রার্থীরা সকলেই নির্বাচনের ঝানু খেলোয়াড়। নির্বাচনে শুধু প্রার্থী ভালো হওয়া, ব্যাপক গণসংযোগ, জোট করা বা প্রচার প্রচারণা’ই সব নয়। ভোটারদের মনে ভয়-ভীতি তৈরী করা, অপপ্রচার, প্রতিপক্ষের দূর্বল দিক গুলোতে আঘাত করা, প্রশাসনিক মেকানিজম, আগের রাত থেকে মাঠ দখলসহ এরকম বহু পন্থা আছে যে ব্যাপারে জামায়াত, এনসিপি, এবি পার্টিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শরীকরা একেবারেই অনভিজ্ঞ। প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার না হলে এই ট্রাডিশনাল নির্বাচন ব্যবস্থায় কম্পিটিশন করে কোন আদর্শবাদী দলের পক্ষে কখনোই পূর্ণাঙ্গ বিজয় পাওয়া সম্ভব নয়। সে বিবেচনায় বিএনপি যোগ্য দল বলেই বিজয়ী হয়েছে।’
আশা করি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দও জনাব মজিবুর রহমান মঞ্জুর মতো চরম বাস্তবতা মেনে নিবেন। পাশাপাশি আগামীতে যেন তারা আরো ভালো করতে পারেন, তার জন্য এই মুহুর্ত থেকে তাদের যে করণীয়, সে বিষয়ে আরো দু’এক কলম লেখার প্রয়াস পাচ্ছি।
জামায়াতের এখন করণীয়
১. বাস্তবতা মেনে নেওয়ার রাজনীতি
৬৮টি আসন কোনো ব্যর্থতা নয়—বরং অতীতের সাফল্যের তুলনায় এটি একটি বিশাল অর্জন। এটাকে “পরাজয়” হিসেবে না দেখে “ভিত্তি নির্মাণের ধাপ” হিসেবে দেখা দরকার। অতিরিক্ত প্রত্যাশা রাজনীতিতে বড়ই আত্মঘাতী বিষয়।
২. কওমী ঘরানার আলেমদের সাথে সুসম্পর্ক
সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনের শেষ দিকে হেফাজতে ইসলামের আমীর এবং কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দী আলেমের জামায়াতের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য তাদেরকে নির্বাচনের মাঠে একটু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই মুহুর্তে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী দল হিসেবে জামায়াতের উচিত উপযাচক হয়ে কওমী আলেমদের সাথে দূরত্ব ঘোচানো এবং যে সকল বিষয়ে তাদের আপত্তি সেই বিষয়গুলো নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা।
৩. প্রশাসনিক পরিপক্বতা অর্জন
ক্ষমাসুন্দর বক্তব্য, ন্যায় ও ইনসাফের ভাষা জনসমর্থন বাড়ায়—কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক ভিশন ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা। জামায়াতকে এখন আদর্শের পাশাপাশি রাষ্ট্রচিন্তার রাজনীতিতে প্রবেশ করতে হবে।
৪. জোটভিত্তিক রাজনীতি ধরে রাখা
জোটের রাজনীতিতে একক আধিপত্য নয়, বরং ইনসাফপূর্ণ সহাবস্থান ও কৌশলগত অংশীদারিত্বই জোটকে টেকসই ও শক্তিশালী করে। এই দায়িত্ব প্রধানত জামায়াতকে নিতে হবে।
৫. দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজি তৈরি
এখন থেকেই আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসনভিত্তিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নিজ দলের পাশাপাশি শরীক দলসমূহেকেও এই ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে। অর্থাৎ আগামী ৫ বছরের রাজনৈতিক রোডম্যাপ তথা নির্বাচনী জোন ভিত্তিক কৌশল গ্রহণ, গ্রামীণ ও নগর রাজনীতির আলাদা মডেল তৈরি, মিডিয়া ও জনসংযোগের দক্ষ ও পেশাদার কাঠামো ইত্যাদি প্রস্তুত করতে হবে।
সর্বোপরি, জামায়াতের জন্য এখন সময় আত্মবিশ্লেষণের, পুনর্গঠনের এবং বাস্তববাদী রাজনীতির। আবেগ দিয়ে বিপ্লব হয় না, বিপ্লব হয় কাঠামো দিয়ে। আদর্শ দিয়ে পথ দেখানো যায়, কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে হয় বাস্তবানুগ কারিগরি দক্ষতা দিয়ে। যদি জামায়াত এই বাস্তবতা বুঝে সংগঠনকে আদর্শবাদের পাশাপাশি শরীয়াহ অনুমোদিত রাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তর করতে পারে, তাহলেই আগামী দিনে তারা সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারবে এবং জনগণ চাইলে ক্ষমতায়ও যেতে পারবে।
মন্তব্য করুন